রাজনীতি

জাতীয় পার্টিতে আবার রওশন–কাদের দ্বন্দ্ব, দুই প্রার্থী ঘোষণা

  প্রতিনিধি ১৪ জুন ২০২৩ , ৯:৪৬:০৬

Spread the love

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিতে আভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের দুজনের ক্ষমতার লড়াই আবার প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। এরইমধ্যে দুজন দুই প্রার্থীকে লাঙল প্রতীকের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন। যা নিয়ে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত এই আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিত না করা গেলে এর রেশ জাতীয় নির্বাচনে পড়বে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।

মাঝে কিছুদিন দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদের অসুস্থতার কারণে দলের পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত ছিল। তবে বিদেশে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে নিজেকে সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন নিজের বলয়। অন্যদিকে নিজের বলয়ের ক্ষমতা পুরোটা ব্যবহারের চেষ্টায় আছেন দলের চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জিএম কাদের।

প্রসঙ্গত, আগামী ১৭ জুলাই ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচন। এই নির্বাচনে হঠাৎ করেই লাঙল প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে মো. মামুনুর রশিদ ওরফে কাজী মামুনের নাম দেন রওশন এরশাদ। বুধবার (১৪ জুন) রওশন এরশাদের কাছ থেকে মনোনয়ন পেয়ে তা নির্বাচন কমিশনে জমাও দিয়েছেন কাজী মামুন।

এদিকে রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত মসিউর রহমান রাঙ্গার নেতৃত্বে মো. মামুনুর রশিদ যখন মনোনয়নপত্র জমা দেন তখন ঢাকা-১৭ ও চট্টগ্রাম-১০ আসনে লাঙলের প্রার্থী হিসেবে দুজনের নাম ঘোষণা করেন জিএম কাদের। তিনি ঢাকা-১৭ আসনের উপ-নির্বাচনে মেজর (অব.) সিকদার আনিছুর রহমান ও চট্টগ্রাম-১০ আসনে মো. সামসুল আলমকে মনোনয়ন দেয় জাতীয় পার্টির মনোনয়ন বোর্ড।

দুই নেতার পক্ষ থেকে দুজনকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও দুইজনই অনড় তাদের প্রার্থীর জন্য প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে। যদিও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষেই প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি যাতে না হতে পারে সেজন্য রওশনপন্থীরা আগেভাবেই ছুটে গেছেন নির্বাচন কমিশনে।

জাতীয় পার্টি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলে। দল গঠনতন্ত্র মতো চলছে কিনা তা দেখভাল করে নির্বাচন কমিশন। বিগত সময়ে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদের সব ধরনের নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছেন। এটাই নিয়ম। তাই নির্বাচন কমিশন এর বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
—জিএম কাদেরপন্থী এক নেতা
জানা গেছে, ঢাকা-১৭ আসনে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী কে হবেন তা স্পষ্ট করতে বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে মসিউর রহমান রাঙ্গার নেতৃত্বে সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল। সিইসির সঙ্গে সাক্ষাতে রওশনপন্থী প্রার্থীকে লাঙ্গল প্রতীকের জন্য বিবেচনা করতে অনুরোধ করেন রাঙ্গা।

নির্বাচন ভবনে সিইসির কার্যালয়ে সাক্ষাতের সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবিব খান ও নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর উপস্থিত ছিলেন।

সভা সূত্রে জানা গেছে, সাক্ষাৎকালে রওশন এরশাদপন্থীদের পক্ষে দলীয় প্রতীক বিবেচনা করতে আদালতের রায়ের কপি দিয়েছেন। সিইসি আদালতের রায়ের কপি সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। যদিও রওশনপন্থীদের এমন তৎপরতা খুব একটা আমলে নিতে রাজি নন জিএম কাদেরপন্থীরা।

তারা বলছেন, জাতীয় পার্টি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলে। দল গঠনতন্ত্র মতো চলছে কিনা তা দেখভাল করে নির্বাচন কমিশন। বিগত সময়ে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদের সব ধরনের নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছেন। এটাই নিয়ম। তাই নির্বাচন কমিশন এর বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।

জিএম কাদেরপন্থী হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির একজন কেন্দ্রীয় নেতা ঢাকা মেইলকে বলেন, নির্বাচন কমিশনে রওশন এরশাদের দেওয়া প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেওয়া হয়েছে বিরোধী দলীয় নেতার প্যাডে। কিন্তু এটা দলীয় প্যাডে দেওয়ার কথা। আবার প্রার্থী চূড়ান্ত করার জন্য একটা মনোনয়ন বোর্ড আছে। তারা মিলে আগ্রহীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে পরে চূড়ান্ত করেছে। আর তার (রওশন এরশাদ) প্রার্থী নিজে নিজে ঠিক করেছে।

এই নেতা আরও বলেন, প্রধান পৃষ্ঠপোষক দলের কাউকে পদোন্নতি, বহিষ্কার, মনোনয়ন কিছুই দিতে পারেন না। তার অধিকারও নেই। তাই এটা নিয়ে টেনশন করার কিছু নেই।

যদিও রওশনপন্থীদের প্রার্থী দেওয়ার নেপথ্যে সরকারের ইন্ধন আছে এমন ধারণাও করছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে রওশন এরশাদ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেও জিএম কাদের এখনো ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন। তাই জিএম কাদেরের অংশকে কিছুটা চাপে রাখার কৌশল হিসেবে প্রার্থিতা নিয়ে সমস্যা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করেন জাপা নেতারা।
এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ঢাকা মেইলকে বলেন, কে কোথায় প্রার্থী হলো এটা দেখা বিষয় না। জাতীয় পার্টি থেকে আমাদের প্রার্থী হবেন একজনই। দলের প্রার্থী কার স্বাক্ষরে মনোনয়ন পাবেন এবং প্রতীক বরাদ্দ পাবেন তা নির্বাচন কমিশন ওয়েব সাইটে সব আছে। পার্টির চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর অনুযায়ী আমাদের মনোনীত প্রার্থীই দলীয় প্রতীক বরাদ্দ পাবেন এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

যদিও রওশনপন্থীদের প্রার্থী দেওয়ার নেপথ্যে সরকারের ইন্ধন আছে এমন ধারণাও করছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে রওশন এরশাদ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেও জিএম কাদের এখনো ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন। তাই জিএম কাদেরের অংশকে কিছুটা চাপে রাখার কৌশল হিসেবে প্রার্থিতা নিয়ে সমস্যা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করেন জাপা নেতারা।

তবে রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ বলছেন ভিন্ন কথা। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ঢাকা-১৭ আসনে যাকে রওশন এরশাদ বেছে নিয়েছেন তিনি যোগ্য প্রার্থী। আমার মনে হয় দলের চেয়ারম্যান শেষ পর্যন্ত তাকে মেনে নেবেন।

অন্য সব নির্বাচন রেখে ঢাকায় কেন এমন সমস্যা হয়েছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, জিএম কাদের যাদের এ পর্যন্ত প্রার্থী করেছেন তাদের বেশিরভাগের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এটা দলের জন্য লজ্জার। তাই ম্যাডাম (রওশন এরশাদ) মনে করলেন ঢাকায় একজন ভালো প্রার্থী দেই। কাজী মামুন সাংগঠনিক লোক। আমরা আশা করি ভোটে সে ভালো করবে। অন্যরাও তাকে মেনে নেবে।

প্রার্থী নিয়ে কেন এই দ্বন্দ্ব?

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে শেষ হওয়া গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাবেক সচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিনকে মেয়রপদে প্রার্থী করেন জিএম কাদের। কিন্তু ভোটের লড়াইয়ে তিনি মোটেও সুবিধা করতে পারেননি। ভোট পেয়েছেন মাত্র ১৬ হাজার ৩৬২টি।

এরশাদপন্থীদের নেতাদের দাবি, জিএম কাদেরের দেওয়া প্রার্থীরা ভোটে সুবিধা করতে না পারায় তারা যোগ্য লোককে ঢাকায় প্রার্থী করেছেন। তবে চেয়ারম্যানপন্থী একজন কেন্দ্রীয় নেতার দাবি, ভোটের পরিবেশ ভালো হলে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হলে তাদের প্রার্থী আরও বেশি ভোট পেতেন।
অন্যদিকে গত ১২ জুন অনুষ্ঠিত বরিশাল ও খুলনা সিটি নির্বাচনে জাপার প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ভোটও পাননি। বরিশালের প্রার্থী ইকবাল হোসেন ৬ হাজার ৬৬৫ ভোট পেয়ে হয়েছেন চতুর্থ। আর খুলনায় মো. শফিকুল ইসলাম পেয়েছেন মাত্র ১৮ হাজার ৭৮ ভোট।

এরশাদপন্থীদের নেতাদের দাবি, জিএম কাদেরের দেওয়া প্রার্থীরা ভোটে সুবিধা করতে না পারায় তারা যোগ্য লোককে ঢাকায় প্রার্থী করেছেন। তবে চেয়ারম্যানপন্থী একজন কেন্দ্রীয় নেতার দাবি, ভোটের পরিবেশ ভালো হলে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হলে তাদের প্রার্থী আরও বেশি ভোট পেতেন।

 

আরও খবর

Sponsered content